সিপিবি সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় ১০ জনের ফাঁসি

২০ জানুয়ারি ২০২০, ১১:৫৮ এএম | আপডেট: ৩১ মে ২০২০, ০১:০৬ পিএম


সিপিবি সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় ১০ জনের ফাঁসি
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলা মামলায় ১০ জনের ফাঁসি দিয়েছেন আদালত। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরসালিন ও নুর ইসলাম। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মশিউর রহমান ও রফিকুল ইসলাম মিরাজকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। সোমবার (২০ জানুয়ারি) ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. রবিউল আলম রায় দেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটর সালাউদ্দিন হাওলাদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আসামিদের মধ্যে মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ ও মো. মশিউর রহমান কারাগারে আটক আছেন। বাকি আসামিরা পলাতক আছেন।

সকাল পৌনে ১০টার দিকে আসামিদের ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। গত ১ ডিসেম্বর মামলার যুক্তিতর্ক গ্রহণ শেষে ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. রবিউল আলম রায়ের জন্য সোমবার ধার্য করেছিলেন। যুক্তিতর্ক গ্রহণের আগে মামলাটিতে ৪৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন আদালত। মামলার ১৩ আসামির মধ্যে মুফতি হান্নানকে বৃটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলা মামলায় ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। বাকি ১২ আসামির মধ্যে ৭ জন পলাতক। বাকি পাঁচজন কারাগারে ছিলেন।

সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ১৩ বছর পর গত বছরের ২৭ নভেম্বর মুফতি হান্নানসহ ১৩ জনকে আসামি করে বিস্ফোরক ও দণ্ডবিধির আইনে পৃথক দু’টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি পুলিশ। সিআইডির ইন্সপেক্টর মৃণাল কান্তি সাহা ঢাকার সিএমএম আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করেন। ৩৪ পাতার মূল চার্জশিটসহ ১০৯ পাতার কেসডকেট আদালতে দাখিল করেন তিনি। চার্জশিটে ১০৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। চার্জশিটের সঙ্গে ৪৬টি আলামতও তিনি আদালতে দাখিল করেন।

প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩০ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ মামলায় মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি করেছেন। আসামি মশিউর রহমান অপর এক মামলায় স্বীকারোক্তি করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির ডাকা লাল পতাকার সমাবেশে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। এ সময় মঞ্চে ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, বাংলাদেশেল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর তৎকালীন সভাপতি সৈয়দ হাসান ইমাম, কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম উপবিষ্ট ছিলেন।

এ হামলায় খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মণ্ডল, খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা আব্দুল মজিদ, ঢাকার ডেমরা থানার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক নেতা আবুল হাসেম ও মাদারীপুরের মুক্তার হোসেন ঘটনাস্থলেই এবং খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিপ্রদাস আহত হয়ে ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ওই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মারা যান। বোমা হামলায় আহত হন সিপিবির শতাধিক কর্মী।

হামলার ঘটনায় সিপিবির তৎকালীন সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোমিন হোসেন ঘটনার নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাননি উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে গ্রেফতারকৃতদের অব্যাহতির আবেদন জানান। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন বোমা হামলার ঘটনার সঙ্গে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার যোগসূত্র খুঁজে পেলে ওই বছরের ২৭ জানুয়ারি মামলাটির কার্যক্রম আবারও শুরু করার জন্য ঢাকার সিএমএম আদালতে আবেদন করেন। ২৯ জানুয়ারি আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করলে নতুন করে আবারও তদন্ত শুরু হয়। এই দীর্ঘ তদন্ত কালে ৭ জন তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন।

আসামি মঈন উদ্দীন তার জবানবন্দিতে বলেন, তিনি মুফতি হান্নানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মাওলানা আবদুস সালাম, মাওলানা আবদুল হাই, শফিকুর রহমান, শেখ ফরিদ, জাহাঙ্গীর বদর ওরফে আবু জান্দাল প্রমুখ জঙ্গিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি হরকাতুল জিহাদের কার্যালয়ে গেলে তিনি জানতে পারেন, পরের দিন অর্থাৎ ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির জনসভা আছে। সেখানেই সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার সিদ্ধান্ত হয়।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, এ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মুফতি শফিকুর রহমান। টাইম বোমা বানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় মুফতি হান্নানকে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু আসামিরা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে সিপিবি নেতাদেরকে ‘কাফের’ আখ্যায়িত করেন। তাদের নিশ্চিহ্ন করাই এ হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল।


বিভাগ : বাংলাদেশ