বড় বড় রাখাল যারা,বনে বসে থাকে তারা 

২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪২ এএম


বড় বড় রাখাল যারা,বনে বসে থাকে তারা 

মামুন মিয়া, আড্ডাঘর:

আজ ১৬ অক্টোবর ২০২৬ । আমি নরসিংদী থেকে প্রায় প্রতিবছর যাত্রা করি কুষ্টিয়ার ছেউরিয়ায়। এবারের সফর সঙ্গী বন্ধু শাহীন, সে ডাক্তার। তার তৈরি নকশায় হবে সমস্ত যাত্রা।

 

যাত্রার শুরুতেই এক মজার ঘটনা রয়েছে। তাহলে শেয়ার করি - ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বেনাপোল এক্সপ্রেসে করে কুষ্টিয়া কোর্ট, সেখান থেকে ১০,২০ টাকা রিক্সাভাড়ায় সহজে সাঈজির ধামে পৌছানো যায়। এই ট্রেন ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে রাত ১১:৩০মিনিটে। তাহলে কমপক্ষে ১১টায় আমার স্টেশন উপস্থিত থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যে, ঢাকা পৌঁছাতে নির্বাচন করলাম "পারাবত এক্সপ্রেস" ট্রেন। শিডিউলে দেয়া তথ্যমতে রাত ১০:৩০ মিনিটে কমলাপুর পৌঁছাবে। কিন্তু এই ট্রেন নরসিংদী স্টেশনে থামে না। ভৈরব এর পর বিমানবন্দর। নরসিংদী থেকে প্রায় ৪০ কিলো. পিছিয়ে ভৈরব জংশনে পারাবতের অপেক্ষা। সবই ঠিকঠাক ভাবে হলো, আমরা টিকিট কেটে ট্রেনে বসলাম। ট্রেন ছুটছে। এবার কোন একটা অজানা কারণে ট্রেন থামলো। কোথায় থামলো? "নরসিংদী স্টেশনে" অপেক্ষা করলো প্রায় ২০ মিনিট। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসি। কখনও আস্তে আবার জোরে। 

 

ট্রেন ছাড়লো। থামবে বিমানবন্দর তারপর কমলাপুর। কিন্তু না, সময়ের তোয়াক্কা না করে এই ট্রেন টঙ্গী যাওয়ার আগে ২বার থামলো অজানা কারনে স্টেশন বিহীন। এবার দুজনেই চিন্তায়, বেনাপোল এক্সপ্রেস ধরতে পারবো কি না।

 

সবই ঠিকঠাক ছিল বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পৌঁছালো প্রায় ৫০ মিনিটে। যা কল্পনায়ও ছিল না। স্টেশন পৌঁছালাম ১১টা ৪৮ মিনিটে। একজন বললো ৫ মিনিট আগে বেনাপোল ছেড়ে গেছে। একটু কষ্ট অনুভব করলাম। আরেকটু রাগ রেল ব্যাবস্থাপনার উপর। এখন একমাত্র উপায় বাস। রওনা হলাম ঢাকা সাইদাবাদ বাস কাউন্টারের উদ্দেশ্যে। 

 

সেখানে আরেক জগৎ। কে কোন গাড়ির টিকিট বিক্রি করছে, আপনার কাছে টিকিট বিক্রি করে আপনাকেসহ আরেক জনের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে, এসব বুঝা মুশকিল। 

কয়েকটা কাউন্টারে কথা বলে বুঝতে পারলাম গাড়ি সংকট, যাত্রী এবং ভাড়া বেশি। যেহেতু এটাই একমাত্র সমাধান সেহেতু টিকিট নিয়ে নিলাম মামুন এসিবাস সার্ভিসের। না না এই বাস আমার না। আমার নামে নাম। 

ফরিদপুর একটা রেস্টুরেন্টে ৩০ মিনিট বিরতি। তারপর সকাল ৭টায় পৌঁছালাম মজমপুর, কুষ্টিয়া। ৩ চাকার ভ্যান নিলাম দুজনে, উদ্দেশ্য সাওতা সাত্তার ফকিরের বাড়ি। উনার পরিচয় সম্পর্কে প্রায় সকলেই অবগত। গত বছর উনার স্ত্রী মা ঝর্ণা রাণী ইহকাল ত্যাগ করেছেন। তার প্রথম তিরোধান উপলক্ষে সেখানেও হচ্ছে সাধুসঙ্গ। 

 

ছেউরিয়া ফিরে উস্তাদকে অবগত করলাম আমাদের উপস্থিতি। তিনি তার কাছে ডেকে নিলেন। এক এক করে বহু পরিচিত ব্যাক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ হচ্ছে। আনন্দ আর আনন্দ। দিন গিয়ে রাত ও কেটে গেল। সূর্যোদয়ের পূর্ব থেকে শুরু হলো গোষ্ঠভাব। একটু পরে কানে ভেসে এল নবপ্রাণ'এর ছোটবড় সবাই মিলে গাইছে মহাত্মা ফকির লালন সাইজির রচিত গোষ্টভাব "

 

"বড় বড় রাখাল যারা,বনে বসে থাকে তারা,

আমায় করে জ্যান্তে মরা ধেনু ফিরানে।"

 

সাঈজির ধাম থেকে একটু দূরে হ্যাচারিতে ১ দিন ছিলাম।সেখানে দেশবরেণ্য অনেক ব্যাক্তির সাথে সঙ্গ করেছি। তারপরদিন "মন আলো"তে আমার উস্তাদ খোকন চিশতী, রিয়াদ উল্লাহ ভূইয়া এবং ইতালির শিল্পি মার্তাসহ অনেকেই সাঈজির ভাব পরিবেশন করেছেন, সবার সাথে বসে স্বরাজ বাজিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি আনন্দ আর আনন্দ। 

২,৪ দিন অবস্থান করে কি পরিমাণ সঙ্গ, ঘুরাঘুরি, নতুন পুরাতন কত মানুষের সাথে যে সাক্ষাৎ হয়, আনন্দ হয় তা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। 

 

তবে দেশ ব্যাপি কিছু আলোচনা সমালোচনা চলতেই থাকে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে। এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য হলো, যেকোন পরিবেশ আপনার প্রতিকূলে বা অনুকূলে থাকবে কেবল আপনার প্রকৃতি অনুযায়ী। 

 

প্রসঙ্গত, এবার সাঈজির ১৩৬তম তিরোধান দিবস। ১,২,৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৭,১৮,১৯ অক্টোবর। ৩ দিন অনুষ্ঠান হলেও সাধু,গুরু,ফকির ও ভক্তরা অনেকেই ৫, ৭, ১০ দিন আগে চলে আসে এবং মেলা শেষ হওয়ার ২,৪,৬ দিন পরে বিদায় নেয় ফকির লালন সাঈজির ধাম, ছেউরিয়া,কুষ্টিয়া থেকে।


বিভাগ : বাংলাদেশ


এই বিভাগের আরও