সরকার শিগগিরই জনগণকে করোনার টিকা দিতে পারবে: রাষ্ট্রপতি

১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:৩৭ পিএম | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:৪৩ এএম


সরকার শিগগিরই জনগণকে করোনার টিকা দিতে পারবে: রাষ্ট্রপতি
সংসদে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সরকার শিগগিরই জনগণকে করোনার টিকা প্রদানে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। সোমবার (১৮ জানুয়ারি) সংসদে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় দ্রুত ভ্যাকসিন কেনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরাসরি কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন কেনা বাবদ ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রদান করা হয়। আশা করছি, সরকার খুব শিগগিরই দেশের জনগণকে কোভিড-১৯-এর টিকা প্রদান করতে পারবে।’

এদিকে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে সুশাসন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাজনৈতিক দলসহ সব শ্রেণী ও পেশার মানুষকে ঐকমত্য গড়ে তুলে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি সোমবার (১৮ জানুয়ারি) সংসদের অধিবেশন শুরুর পর ভাষণ দেন। প্রতিবারের মতো এবারও তিনি মন্ত্রিসভার ঠিক করে দেওয়া ভাষণের সংক্ষিপ্তসার পড়েন। এর আগে বিকাল সাড়ে ৪ টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবার বছরের শুরুতে অধিবেশনের প্রথম দিন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার তা করা হয়নি।

কোনও সংসদের প্রথম এবং নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয়। পুরো অধিবেশনজুড়ে ওই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন সংসদ সদস্যরা। আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।

সোমবার স্পিকার রাষ্ট্রপতির আগমনের ঘোষণা দিলে সশস্ত্র বাহিনীর একটি বাদক দল বিউগলে ‘ফ্যানফেয়ার’ বাজিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্ভাষণ জানায়। সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি ঢোকার পর নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এর আগে বিকাল ৪টার দিকে সংসদ ভবনে ঢোকেন রাষ্ট্রপতি।

স্পিকারের অনুরোধের পর রাষ্ট্রপতি তার লিখিত ভাষণের সংক্ষিপ্তসার পড়া শুরু করেন। এসময় তার মূল বক্তব্য পঠিত বলে গণ্য করার জন্য স্পিকার শিরীন শারমিনকে অনুরোধ জানান আবদুল হামিদ। স্পিকারের আসনের বাম পাশে রাখা ‘রোস্ট্রামে’ দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন তিনি।

১৪৭ পৃষ্ঠার ভাষণের সংক্ষিপ্তসারে রাষ্ট্রপতি অর্থনীতি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, খাদ্য-কৃষি, পরিবেশ-জলবায়ু, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের কার্যক্রম ও সাফল্য তুলে ধরেন। এছাড়া দেশে আইনের শাসন সুসংহত ও সমুন্নত রাখা এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারে ভূমিকার প্রশংসা করে ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সরকার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সব ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সাফল্যের সাসঙ্গে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে ২ হাজার চিকিৎসক ও ৫ হাজার ৫৪ জন নার্সকে নিয়োগ দান করা হয়েছে। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে ১০ হাজার ৫২৫টি সাধারণ বেড, ৬৬৬টি আইসিইউ এবং ৭৩টি ডায়ালাইসিস বেড, ৫৫৪টি ভেন্টিলেটর, ১৩ হাজার ৫১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার, ৬৭৮ হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা এবং ৬৩৯টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

দল-মতের পার্থক্য ভুলে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, ‘‘দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সুশাসন সুসংহতকরণ, গণতন্ত্র চর্চা ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে দেশ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আসুন, দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।’’

জাতীয় সংসদ দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু উল্লেখ করে ভাষণে আবদুল হামিদ বলেন, ‘গণতন্ত্রায়ন, সুশাসন ও নিরবচ্ছিন্ন আর্থসামাজিক উন্নয়নে সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমি উদাত্ত আহ্বান জানাই। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। আমি সরকারি দল ও বিরোধী দল নির্বিশেষে মহান জাতীয় সংসদে যথাযথ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাই।’

আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরে রাষ্ট্রপ্রধান হামিদ বলেন, ‘সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও উৎকর্ষসাধন এবং প্রাজ্ঞ রাজস্বনীতি ও সহায়ক মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত এক দশকে গড়ে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও পর পর তিন বছর ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক এক-পাঁচ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এ ধারাবাহিক অর্জন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক দুই-চার শতাংশে। তবে একইসময়ে মাথাপিছু জাতীয় আয় ৮ দশমিক এক-দুই শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। আইএমএফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘‘আমরা আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যে পথে আমরা হাঁটছি, সে পথেই আমাদেরকে আরও এগিয়ে যেতে হবে। এ বছর মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে আমরা ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’ পালন করবো। তবে, আমাদের লক্ষ্য ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়া। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা একটি কল্যাণমূলক, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সক্ষম হবো।’’

বাংলাদেশ দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রেখেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কৃষি উন্নয়নের সফলতা বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে মর্যাদার নতুন আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে পরিবেশবকান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। কৃষি উন্নয়নে সরকারের সব সুযোগ সুবিধা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন করে বিদেশে কৃষ্টিপণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সক্ষম হবে।’

 


বিভাগ : বাংলাদেশ