গবাদিপশু উৎপাদনে নীরব বিপ্লব: দেশীয় পশুতেই মিটবে কোরবানির চাহিদা

১৩ জুলাই ২০১৯, ০১:১৬ পিএম | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০১৯, ১২:২০ পিএম


গবাদিপশু উৎপাদনে নীরব বিপ্লব: দেশীয় পশুতেই মিটবে কোরবানির চাহিদা
নরসিংদীর একটি খামারের ছবি

টাইমস ডেস্ক:

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে দেশিয় পশু পালন ও এসব পশুর চাহিদা বেড়ে গেছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু রপ্তানি বন্ধ ও সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় এ পরিবর্তন হয়েছে।

সরকারের নানা উদ্যোগে গরু ও ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। গত এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন লাখ। দেশে সারা বছর মাংসের জোগান ও কোরবানির চাহিদা মেটানোর পর এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে গরু-ছাগলের মাংস। গবাদিপশু উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে দেশে।

কোরবানির ঈদের বাকি এক মাসেরও কম। তাই দেশীয় খামারিরা পশু বিক্রির সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছেন। এখন তারা কোরবানির পশু বিক্রির সময় গুনছেন। আর দেশীয় পশুতে এবারের কোরবানির চাহিদাও মিটবে বলে আশা করছেন। তাদের দাবী, যেনো দেশের বাইরে থেকে পশু আমদানি না করা হয়।

যদিও গত ঈদের চেয়ে এবার গো খাদ্যের দাম চড়া, তারপরও একটু লাভের আশায় সে খাদ্যের যোগান দিয়ে কোরবানির গরু প্রস্তুত করেছেন খামারিরা। এই লাভ পাবেন বলে বেশ আশাও করছেন তারা। যদি বিদেশ থেকে কোরবানির পশু দেশে না প্রবেশ করে, তাহলে সেই কাঙ্ক্ষিত লাভ হাতে আসবে খামারীদের।

 

আসন্ন কোরবানি ঈদ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) গবাদিপশুর সংখ্যা-সংক্রান্ত একটি চিঠি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এতে উল্লেখ করা হয় আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির গরুর চাহিদা মেটাবে দেশিয় গরু।

এর জন্য এক কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩টি পশু প্রস্তুত আছে। চোরাই পথে গরু-ছাগল না এলে কোনো সংকট হবে না। এর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৩ এবং ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭২ লাখ। সরকারি আটটি খামারে উট-দুম্বাসহ কোরবানির প্রাণি আছে আরও সাত হাজার। গত বছর কোরবানিতে জবাই হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ পশু। এর মধ্যে ছাগল-ভেড়া ছিল ৭১ লাখ। গরু ৪৪ লাখ।

দেশে গত বছরের চেয়ে গরুর উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার আর ছাগল-ভেড়ার উৎপাদন বেড়েছে এক লাখ। এর আগে ২০১৭ সালে কোরবানিতে জবাই হয়েছিল ১ কোটি চার লাখ ২২ হাজার পশু। ধারাবাহিকভাবে দেশে গরু-ছাগলের উৎপাদন বাড়ছে। ২০১৮ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ঘোষণা দেয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, গবাদিপশু উৎপাদনে বিশ্বে দ্বাদশ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এককভাবে ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। ছাগলের দুধ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়।

কোরবানির ছয় মাস আগ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। খামারিদের নানা ধরনের পরামর্শ ও কোরবানির পশুর স্বাস্থ্যগত সেবা দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ে মনিটরিংয়ের জন্যও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তারা নেমে পড়েছেন। কেউ যাতে কোরবানির পশু মোটাতাজাকরণে ওষুধ ব্যবহার না করেন, সে বিষয়েও পরামর্শ দিচ্ছে তারা। এর জন্য দল বেঁধে খামারে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

এদিকে, বাংলাদেশে মোট নিবন্ধিত খামার এর সংখ্যা ৬৬ হাজার, অনিবন্ধিত ৭০ হাজার। সবমিলে খামারের সংখ্যা এক লাখ ৩৬ হাজার। এসব খামার থেকে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হাতে এসে পৌঁছে গেছে কোরবানির পশুর তথ্য। এবার গবাদি পশু (গরু ও মহিষ) প্রস্তুত ৪৫ লাখ। ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত ৭২ লাখ। সবমিলে এক কোটি ১৭ লাখ পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত। সর্বোচ্চ এক কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হতে পারে বলে ধারণা। ফলে এবারও সাত লাখ পশু অবিক্রিত থেকে যেতে পারে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. হিরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, চাষি ও খামারিরা পশুর দাম বেশি পাচ্ছেন। ফলে পশু পালনে বাংলাদেশে সফলতা এসেছে। সরকার এ বিষয়ে নানা সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। কোরবানির ঈদে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় বেশি পশু মজুদ আছে। ভারত থেকে কোরবানির পশু আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। এখন আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত কোরবানির ঈদে প্রস্তুত থাকা ১০ লাখ পশু অবিক্রিত ছিল। আশা করা হচ্ছে, এবারও চাহিদার তুলনায় কোরবানির পশু অবিক্রিত থাকবে।

২০১৪ সালে ভারত সরকার এ দেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয় হঠাৎ। এরপর গরু-মোটাতাজাকরণে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে আড়াই শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয় খামারিদের। ওই সুবিধা পেয়ে সারাদেশে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার তরুণ গরুর খামার গড়ে তোলেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত খামারির সংখ্যা হচ্ছে ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৪১৬ জন। সারাদেশে গরু-ছাগলের খামার গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় লাখ। ফলে গরু-ছাগলের উৎপাদন বাড়ছে।

 

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সম্প্রতি সারাদেশে গরু-ছাগলের চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এতে একটা সাড়া পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে যেসব এনজিও কাজ করছে, তাদের অধিকাংশ এখন ঋণ দিচ্ছে গরু পালনে। এ খাতে বিনিয়োগ করছে ব্যাংকগুলোও। এতে গরু পালন বেড়েছে অনেক দ্রুত। চামড়াশিল্পেও রফতানি আয় বাড়ছে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ইমরান হোসেন বলেন, দেশি গরুর চাহিদা বাড়ায় শিক্ষিত তরুণ ও প্রবাসীরা গবাদিপশুর খামারে বিনিয়োগ করছেন। গরু আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে এ খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়বে। কোরবানির হাটে ক্রেতারা দেশি গরু খোঁজেন হন্য হয়ে। তারা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মোটা করা বিদেশি গরু কিনতে চান না।


বিভাগ : অর্থনীতি