আজ নরসিংদী মুক্ত দিবস : ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন

১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৪৮ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২০, ০৯:৪০ এএম


আজ নরসিংদী মুক্ত দিবস : ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন

আজ ১২ ডিসেম্বর, নরসিংদী হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে নরসিংদী মুক্ত হয়েছিল। এ দিনে সম্মিলিত মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে নরসিংদী শহরসহ গোটা জেলা পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ দিনটি নরসিংদীবাসীর কাছে গৌরবোজ্জ্বল ও স্মরণীয় দিন। প্রতি বছরই দিবসটি পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে জেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।


১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক খ- যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতার শিকার হয়ে শহীদ হন ১১৬ জন বীর সন্তান। এর মধ্যে নরসিংদী সদরের ২৭, মনোহরদীর ১২, পলাশে ১১, শিবপুরের ১৩, রায়পুরায় ৩৭ ও বেলাব উপজেলার ১৬ জন।


রাজনৈতিকভাবে অগ্রসরমান ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এক অদম্য শক্তি নিয়ে, স্বপ্রণোদিতভাবে। যুদ্ধ অনভিজ্ঞ তরুণ ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, জনতা প্রতিশোধ ¯পৃহায় অটুট মনোবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মনোবলই যে অধিকতর শক্তিশালী পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে তার প্রমাণ রেখেছেন নরসিংদীর বীর মুক্তিযোদ্ধারা।


১৯৭১‘র পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা মনে করে এখনো ভয়ে আতকে উঠেন নরসিংদীবাসী। স্বজন হারানোদের কান্নায় এখনও ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার সাক্ষী ২২টি গণকবর রয়েছে নরসিংদী জেলাজুড়ে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হলেও এখনও অযতœ ও অবহেলায় পড়ে আছে এসব গণকবর। সংরক্ষণ না করায় অরক্ষিত এসব গণকবরের শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।


মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নরসিংদীর এমন কোনও স্থান নেই যেখানে ৭১-এ শত্রু সেনাদের নিষ্ঠুর ছোবল পড়েনি। ১৯৭১ সালে নরসিংদী জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকেই নরসিংদী জেলায় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ৭১এ বর্তমান জেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৭/২৮ জনকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যা¤প নরসিংদীর টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আটক রাখা হতো। নির্যাতন শেষে তাদের নিয়ে যাওয়া হতো বর্তমান ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাঁচদোনা মোড় সংলগ্ন লোহারপুলের নীচে। সেখানে ৪/৫ জনকে বসিয়ে রেখে তাদের সামনে ২০/২২ জনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। হত্যা শেষে লোহারপুলের নীচে সবাইকে একসঙ্গে মাটিচাপা দেয়। আজও স্থানীয় বাসিন্দাদের কানে সেদিনের আত্মচিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। বোমা বর্ষণ ও নরসিংদী দখলের পর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কারণে বিক্ষুদ্ধ অসহায় জনতা আক্রোশে ফুঁসতে থাকে। নরসিংদীর নেতারা, ই.পি.আর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্য এবং যুবক শ্রেণি দ্রুত নরসিংদী শহর ছেড়ে চলে যায়।


৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক খ- যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ৭১এর মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কো¤পানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে নরসিংদীতে ই.পি.আর, আনসার ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। এতে হাজার হাজার ছাত্র জনতা তাদের স্বাগত জানায়। নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে শত শত যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে শুরু হয় প্রতিবাদ. প্রতিরোধ ও চোরাগুপ্তা হামলা।
মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী জেলা ছিল ২নং সেক্টরের অধীনে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ। নরসিংদীকে ৩নং সেক্টরের অধীনে নেওয়া হলে কামান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এএনএম নূরুজ্জামান, পরবর্তীতে রক্ষীবাহিনী প্রধান।


নরসিংদী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল মোতালিব পাঠান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নরসিংদীর মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরŸোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। সশস্ত্র যুদ্ধে জেলার বিভিন্ন স্থানে শত শত নারী পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে গণকবর দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। গণকবরগুলোর বেশিরভাগই চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাতের পর ৪ এপ্রিল পাকিস্তানীদের বিমান হামলায় নরসিংদী শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। এ হামলায় শহীদ হন আব্দুল হক, নারায়ণ চন্দ্র সাহা, চাঁদ মোহন দাস, জগদীস দাস, নির্মল দাসসহ নাম না জানা আরও অনেকে।এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নরসিংদীর পাঁচদোনা ব্রিজে বিভিন্ন যানবাহন থেকে যাত্রীদের নামিয়ে পাকসেনা ও তাদের দোসর রাজাকাররা নিরীহ মানুষদের হত্যা করে ব্রিজের নিকট গণকবর দিয়েছে। এ স্থানটি বধ্যভূমি হিসেবে সরকার কর্তৃক চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জেলার সবগুলো বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নরসিংদীতে অনেকগুলো মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিবাহিনীরা মার্চ মাস থেকেই সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে পাক বাহিনীর অন্তরাত্ম কাঁপিয়ে দেয়।


২৩ মে তৎকালীন মুসলীম লীগ নেতা মিয়া আবদুল মজিদ মুক্তিসেনাদের গুলিতে নিহত হন। এর পরেই পাক বাহিনী নরসিংদী টেলিফোন ভবনে ঘাটি স্থাপন করে। স্থানীয় টাউট, দালাল ও রাজাকারদের যোগসাজশে হানাদার বাহিনীরা প্রতিদিন চালায় ধর্ষণ, নরহত্যা ও লুটতরাজ। অপরদিকে বাংলার মুক্তি পাগল ছেলেরা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয় এবং আঘাত হানে শত্রু শিবিরে।


নরসিংদী সদর উপজেলায় নেহাব গ্রামের নেভাল সিরাজের নেতৃত্বে হানাদার প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তোলা হয়। ওই স্থান থেকে সমগ্র জেলায় মুক্তিযোদ্ধারা নিরলস ভাবে তৎপরতা অব্যাহত রাখে। নরসিংদীকে মুক্ত করতে পাক বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা যে সব স্থানে যুদ্ধে অবর্তীণ হয়েছিলেন এবং গণহত্যা ও গনকবর ও বধ্যভূমি সে স্থান গুলো হলোÑ নরসিংদীর সদর উপজেলার বাঘবাড়ী, পালবাড়ী, আলগী, পাঁচদোনা, খাটেহারা ব্রীজে প্রথম ও দ্বিতীয় রেইড,শিলমান্দি গ্রামে রেলগাড়ীতে অ্যাম্বুশ,অপারেশন বড়ৈবাড়ী ইত্যাদি । শিবপুরে পুটিয়া, ঘাসির দিয়ার মাইন বিস্ফোরণ ,অপারেশন ভরতের কান্দি,বানিয়াদির যুদ্ধ, চন্দনদিয়া, দত্তের গাঁও, দুলালপুর, মরজাল, যোশর বাজার, লেটারবর, কাটাঘাট বাজার। মনোহরদী উপজেলার হাতিরদিয়া বাজার, হেতিমদি, দশদোনা অ্যাম্বুশ,মনোহরদী ডাকবাংলো রেইড,হাতিরদিয়ার এ্যামবুশ, রামপুর এ্যামবুশ,পাতিরদিয়ায় গরুর গাড়ী বহরে আক্রমণ,ব্রহ্মপুত্র নদীতে লঞ্চ আক্রমণ,মনোহরদী থানা আক্রমণ,হানাদারদের চালাকচর বাজার ঘেরাও ,গাইকাল অ্যাম্বুশ।


রায়পুরা উপজেলার শ্রীরামপুর বাজার, রামনগর, মেথিকান্দা, হাটুভাঙ্গা, বাঙালীনগর, খানাবাড়ী, আমিরগঞ্জ ব্রিজ, গৌরিপুর গণহত্যা, কোহিনুর জুট মিল গণহত্যা, তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ ,শ্রীরামপুর বাজার পোড়ানো,রামনগর ঘেরাও এবং গণহত্যা,রামনগরের দ্বিতীয় যুদ্ধ,রায়পুরা মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হানা আক্রমণ,রামনগর গ্যাস লাইন অপারেশন,রায়পুরা সদর কলোনীর যুদ্ধ,দৌলতকান্দি প্রতিরক্ষা অভিযান, গৌরীপুর গণহত্যা ,কোহিনুর জুট মিল হত্যাকান্ড, ইত্যাদি । নরসিংদী সদরে বাদুয়ারচরে বাড়ী - ঘর পোড়ানো ও নির্যাতন,আলগী রেইড,চিনিশপুর তিতাস গ্যাস সাব-স্টেশনে রেইড,ইউনাইটেড মেঘনা চাঁদপুর (ইউএমসি)পাটকলে পণ্যবাহী জাহাজ ধ্বংস,তিতাস গ্যাস লাইন অপারেশন,আনন্দীতে বৈদ্যুতিক টাওয়ার অপারেশন, পাল বাড়ীর যুদ্ধ ব্রাহ্মন্দী হাই স্কুলে আক্রমণ ইত্যাদি । বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর বাজার, পোড়াদিয়া বাজার অ্যাম্বুশ বড়িবাড়ী ও নীলকুঠি নামক স্থানে গনহত্যা । ঘোড়াশাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ রেইড, ফৌজি চটকলের নিষ্ফল অপারেশন, পাক-বাহিনীর নেহাব গ্রাম ঘেরাও, নেহাব গ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ, শীতলক্ষ্যা নদীতে গানবোট আক্রমণ,ঘোড়াশাল ব্রীজ অপারেশন ,ভোলাব গ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ,শিল্পাঞ্চলের যুদ্ধ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের চরাপাড়ায় আগুন ও হত্যা, ডাঙ্গায় গণহত্যা,ডাঙ্গা এলাকায় জ¦ালাও - পোড়াও,খিলপাড়ায় গণহত্যা,আটিয়া গ্রামে গণহত্যা ও আগুন,জিনারদীর যুদ্ধ,মূলপাড়ার যুদ্ধ ,জিনারদি রেলস্টেশনে রেইড ও পাশ্ববর্তী,ছনপাড়া ও বাগহাটার কালভার্ট উড়ানো,ঘোড়াশাল ব্রীজ ও রেলস্টেশন রেইড, ন্যাশনার জুট মিল হত্যাকান্ড ইত্যাদি ।


বেলাব যুদ্ধের সময় আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে বেলাব বড়িবাড়ীর নীলকুঠির যুদ্ধে হানাদারদের হাতে শহীদ হন সুবেদার আবুল বাশার, মমতাজ উদ্দিন, আব্দুস সালাম ও আব্দুল বারী। এছাড়া পাক হানাদার বাহিনী বড়িবাড়ী বাজনাবরের নিরীহ ৮/১০ জনকে ধরে এনে এক সঙ্গে গুলি করে হত্যা করে এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাক বাহিনীরা রাজাকারদের সহযোগিতায় নরসিংদী জেলার ২২টি বধ্যভূমিকে বিভক্ত করে নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়ে ছিল।
নরসিংদীর ৬ উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদেরমধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান, প্রাক্তন মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভূইয়া, প্রয়াত সাংসদ আফতাব উদ্দিন ভূইয়া, সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহম্মেদ রাজু, প্রয়াত সাংসদ মেজর (অব.) সামসুল হুদা বাচ্চু, সাবেক সাংসদ অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন, সাবেক সাংসদ সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল, সাবেক সাংসদ আব্দুল আলী মৃধা, নেভার সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, ফজলুর রহমান ফটিক মাস্টার, আজিজুর রহমান ভুলু, মজনু মৃধা, আব্দুল রাজ্জাক ভূইয়া, কাজী হাতেম আলী, প্রয়াত হাজী গয়েছ আলী মাস্টার, প্রয়াত নূরুল ইসলাম কাঞ্চন, আলী আকবর, মো: আমানুল্লাহ, সিরাজুল হক, তাজুল ইসলাম খান, অধ্যাপক মো: ইউনুছ, আব্দুল মোতালিব পাঠান, মীর এমদাদ, মো. নুরুজ্জামান, আব্দুল লতিফ, হাবিবুল্লাহ বাহার, নিবারণ রায়, মনছুর আহম্মেদ, আলী আকবর সরকার, নুরুল ইসলাম গেন্দু, বাবর আলী মাস্টার, আবেদ আহমেদ, আব্দুল হাই, সমশের আলী ভূইয়া, মতিউর রহমান মাস্টার, আব্দুল মান্নান খান, তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, বিজয় চ্যাটার্জী, ইমাম উদ্দিন ও সাদেকুর রহমান।


মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শহীদ হয়েছেন- গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সরোজ কুমার অধিকারী, ড. সাদত আলী, মো: শহীদুল্লাহ, মো: সামসুজ্জামান ও মো: ফজলুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন নরসিংদীর ৯ জন। তারা হলেন ফ্লাইট লে. শহীদ মতিউর রহমান (বীরশ্রেষ্ঠ), লে. কর্নেল আব্দুর রউফ (বীর বিক্রম), সুবেদার খন্দকার মতিউর রহমান (বীর বিক্রম), বিগ্রেডিয়ার (অব.) এএনএম নুরুজ্জামান (বীর বিক্রম), সুবেদার ফজলুর রহমান (বীর বিক্রম) ও শহীদ মোঃ শাহাবুদ্দিন নান্টু (বীর বিক্রম) নেভাল সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ (বীর প্রতিক), লে. কর্নেল (অব.) মো: নজরুল ইসলাম হীরু (বীরপ্রতিক), হাবিলদার মোঃ মোবারক হোসেন (বীর প্রতীক) ।

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর বিকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রামচরন সিং-এর নেতৃত্বে একটি ব্রিগেড ১১টি হেলিকপ্টার নিয়ে নরসিংদী শহরের পার্শ্ববর্তী বালুশাইর চকে অবতরণ করে। এরপর ভারতীয় বিমান বাহিনীর মিগ-২১ যুদ্ধ বিমান নিয়ে নরসিংদী শহরের পাকবাহিনীর ক্যা¤প লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমা বর্ষণ শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে পাকসেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে।


তাছাড়া জিনারদী রেল ষ্টেশনের পূর্ব পাশে পাটুয়া গ্রামে সংঘটিত হয় একটি যুদ্ধ। যুদ্ধটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ যুদ্ধের মধ্যেই নিহিত ছিল নরসিংদীকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করার মুহূর্তটি। ইতোমধ্যেই নরসিংদীর আশ-পাশের থানাগুলো থেকে হানাদার বাহিনী তাদের তল্পি-তল্পা গুটাতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল চাপের মুখে তাই নরসিংদীর হানাদাররাও যেকোন মুহূর্তে ঢাকা চলে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে। সম্ভবত ঃ এমনি একটি দল ১২ ডিসেম্বর সকাল বেলায় জিনারদী রেল ষ্টেশনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এ খবর পৌছামাত্র ন্যাভাল সিরাজের নেতৃত্বে একটি দল পাটুয়া গ্রামে হানাদারদের গতি রোধ করে। শুরু হয় প্রচন্ড যুদ্ধ। প্রায় ঘন্টাখানেক যুদ্ধ চলার পর মনোবল ভাঙ্গা ২১জন হানাদার অস্ত্র-শস্ত্রসহ মুক্তিযোদ্ধাদের কছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ফলে ১২ ডিসেম্বর নরসিংদীকে সম্পূর্ণ মুক্ত এলাকা বলে ঘোষণা করা হয় এবং বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে বিজয় মিছিল বের করা হয়। ২১জন হানাদারের মধ্যে ২জন মারাত্মক আহত হওয়ায় তাদেরকে হত্যা করা হয়। বাকী ১৯ জনকে স্বাধীনতার পর ১৭ জানুয়ারী মেজর হায়দারের মাধ্যমে রমনা থানায় জমা দেয়া হয়। এমনিভাবে নরসিংদীতে সমাপ্তি ঘটে নয় মাসের শ^াসরুদ্ধকর মুক্তি যুদ্ধের। মুক্তির আনন্দে জনগণ উদ্বেল হয়ে ওঠে এবং লাভ করে পরম শান্তি। মুক্তিযোদ্ধারা লাভ করে জনগণের অকুণ্ঠ ভালবাসা ।

লেখক : গবেষক, লেখক ও চেয়ারম্যান , নরসিংদী প্রেসিডেন্সি কলেজ , ব্রাহ্মন্দী, নরসিংদী ।

 


বিভাগ : মতামত