জমতে শুরু করেছে রাজশাহীর আমের বাজার

১১ জুন ২০১৯, ১২:১১ পিএম | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:১২ পিএম


জমতে শুরু করেছে রাজশাহীর আমের বাজার

রাজশাহী প্রতিনিধি :

রাজশাহীর বেশিরভাগ চাষি এবার রোজার মধ্যে গাছ থেকে আম নামাননি। তবে ঈদের পর তারা আম পাড়তে বা নামাতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। ফলে বাজারও ভরে উঠতে শুরু করেছে কাঁচাপাকা আমে। রোজার মধ্যে আমের বেচাকেনা স্থবির থাকলেও এখন ধীরে ধীরে জমে উঠছে বলেই জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

গত ১২ মে চলতি মৌসুমের আমপাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেয় জেলা প্রশাসন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৫ মে থেকে দেশি জাতের গুঁটি আম পাড়া শুরু হয়। ২০ মে থেকে গোপালভোগ, ২৮ মে খিরসাপাত, ৬ জুন ল্যাংড়া আম গাছ থেকে পাড়া শুরু করে চাষিরা। আর ১৬ জুন আম্রপালি, ফজলি ও সুরমা ফজলি এবং ১ জুলাই আশ্বিনা আম পাড়া যাবে। 

রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল ঢাকা বাসস্ট্যান্ড ও শালবাগানে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারও এখানে আমের বাজার বসতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে আম এনে ঝুড়িতে করে সাজিয়ে রাখছেন। বিক্রেতারা জানালেন, আম নিয়ে সবার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী বছরের ছয় থেকে সাত মাস বাড়িতে থাকেন। বাকি সময় তিনি বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে কাজ করেন। আর যে সময়টাতে তিনি বাড়িতে থাকেন, সেটা আমের মৌসুমে। নিজের আম বাগান মাত্র ১০ কাঠা জমিতে। এবার লিজ নিয়েছেন চার বিঘা। তার বাগানের গাছে আম বলতে খিরসাপাত, ল্যাংড়া আর আম্রপালি।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২৮ মে থেকে রাজশাহীতে খিরসাপাত আম পাড়া শুরু হয়েছে। আর ল্যাংড়া নামানো শুরু হয়েছে ৬ জুন থেকে। তবে ইয়াকুব আলী এখনো পর্যন্ত মোটে তিন মণ আম বিক্রি করেছেন হাটে। গত ১/২ জুন থেকে তার বাগানের গাছে খিরসাপাত আমে পাক ধরেছে। তবুও তা পাড়েননি ইয়াকুব আলী। কারণ হিসেবে জানালেন, ঈদের আগে আমের দাম না পাওয়ার শঙ্কার কথা।

ঈদ উৎসব শেষ, দুই/চার দিনের মধ্যেই গাছ থেকে সব খিরসাপাত নামিয়ে বাজারজাত করতে হবে ইয়াকুব আলীকে। দাম ভালো পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ইয়াকুব লিজ নেওয়া বাগানে বসেই আম পাড়ার জালতা বা টুসি মেরামত করতে করতে বলেন, গত দু-তিন বছর ঈদের মধ্যেই পড়ছে আম নামানোর ডেট (তারিখ)। মহা মুসিবত, গাছে আমে পাক ধরে যায়, কিন্তু বাজারে ভালো দাম না থাকায় নামানোও যায় না। ঈদও মাটি হয়, সঙ্গে লোকসানও গুণতে হয়।

তিনি বলেন, ‘এই যে ঈদটা গেল, মেয়ে দু’টোকে কিচ্ছু কিনি দিতি পারিনি। হাত সাজানোর মেহেদি কেনার বায়না ধরেছিল ছোট মেয়ে, তাও দেইনি। বলেছি-আম বিক্রি করে মার্কেট করে দেব। বউ তো কিছু চায়-ই না। তবুও আমে ভালো দাম পেলে নতুন কাপড়চোপড় আর খাওয়া-দাওয়া হবে। না হলে শেষ।’ ঈদ শেষে আমের বাজার ভালো হলে আরেক ‘ঈদ’ আসবে, এমন প্রত্যাশা শুধু ইয়াকুব আলীর নয়, রাজশাহীর আমচাষিদের মধ্যেও।

জেলার পুঠিয়া, বানেশ্বর, চারঘাট, বাঘা, মোহনপুর, গোদাগাড়ী, তানোরে ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ শেষে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের এখন আম নামানো কাজের তোড়জোড়। বাগানে আম নামিয়ে তা ক্যারেটে করে বাজারজাতকরণের কাজ শেষ করা হচ্ছে বাগানে বসেই। চাষিরা এখন খিরসাপাত আম দ্রুত বাজারজাত করতে চাইছেন। পাক ধরে যাওয়ায় গাছে ৪ থেকে ৫ দিনের বেশি খিরসাপাত আম রাখা কষ্টসাধ্য বলছেন তারা।

আমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গোপালভোগ শেষের পথে। বাগানে বেশি আম খিরসাপাত। গাছে ধরেও বেশি এই জাতের আম। একটু পাকলেই পড়ে যায়। কোনোভাবে যদি এখন ঝড় হয়, তবে আম পড়ে সব নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও মাথায় রাখতে হচ্ছে তাদের।

মোহনপুরের বকশিমইল গ্রামের আজিবর মিয়া বলেন, ঈদের কারণে বাজার ভালো ছিল না খিরসার। এখন দাম বাড়বে। মণপ্রতি ২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হতে পারে। খিরসা নামানোর পর ল্যাংড়ায় হাত দেব। তবে অনেকে এখন দাম বেশি পাওয়ার আশায় ল্যাংড়াও পাড়া শুরু করছে। আমার মনে হয়-ল্যাংড়াটা আরও ৪ থেকে ৫ দিন পর নামালে বেশি ভালো হবে।

চারঘাটের মোক্তারপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, খিরসাপাত আম ঈদের আগে পাড়া দরকার ছিল। গত শনিবার সকালে বাগানে গিয়ে দেখি, ব্যাপক আকারে পাকা আম পড়ে রয়েছে। গাছেও পেকে গেছে। এই আম পেড়ে বাজারে নিতে নিতে বেশি পেকে যাবে। যা কেউ কিনতে চায় না। রাজশাহীর আম দূর-দূরান্তে যায়। তাই সবাই কাঁচা আমের দিকে বেশি ঝোঁকে। মনে হচ্ছে-লোকসান গুণতে হবে।

এদিকে রাজশাহীর সবচেয়ে বড় হাট বানেশ্বর বাজার ঘুরে দেখা গেছে- হাটে আসা আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা সবাই প্রায় খিরসাপাত আম নিয়ে এসেছেন। কেউ কেউ গোপালভোগ এবং কিছু ল্যাংড়া এনেছেন। সঙ্গে লক্ষ্মণভোগও দেখা গেছে। গোপালভোগ শেষ দিকে হওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে।

বানেশ্বর বাজারে গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা মণ। খিরসা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা মণ। আর অল্প পরিমাণে বাজারে আসা ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা মণ। তবে ঈদ ফুরালেও এখনো সেভাবে জমে ওঠেনি আমের বাজার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছর রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। ২ লাখ ১৩ হাজার ৪২৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে শুধু বাঘা উপজেলাতে ৮ হাজার ৩৬৮ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে।


বিভাগ : বাংলাদেশ