গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দেশবাসীর কাছে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’

০২ জুলাই ২০১৯, ১২:৩২ পিএম | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫১ এএম


গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দেশবাসীর কাছে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জনমতকে প্রাধান্য না দিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এতে সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ সরকারের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। চায়ের দোকান, গণপরিবহন ও অফিসপাড়াতে সাধারণ মানুষের আড্ডায় গ্যাসের দাম বাড়ার বিষয়টি প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। এদিকে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। এক ধাপ এগিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোট প্রতিবাদের পাশাপাশি আগামী ৭ জুলাই সারা দেশে ৬ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করেছে।
দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর থেকে রাজধানীর সর্বত্রই গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে গণপরিবহন, ফুটপাতের চায়ের দোকান থেকে অফিসপাড়া পর্যন্ত সর্বত্রই সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভোক্তা, ব্যবসায়ী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজের ব্যক্তিরাও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ কমপক্ষে ১.৫ ভাগ বেড়ে যাবে। গ্যাসের দাম ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে বড় মনে না হলেও প্রকৃতপক্ষে শিল্প-কারখানায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সংগ্রাম করে টিকে থাকা একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি আরেকটি আঘাত।

কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। দুর্নীতির কারণে গ্যাস উন্নয়ন ও গ্যাস নিরাপত্তা তহবিল বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। আমরা প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। ১০ শতাংশ গ্যাস চুরি হয়। এই চুরি বন্ধ করা হলে চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা সমন্বয় করা সম্ভব।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শাকিল আহম্মেদ বলেন, এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা মধ্যবিত্তের স্বার্থবিরোধী। গ্যাস রাষ্ট্রীয় সম্পদ, এর মালিক জনগণ। জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করতে পারে না। জনগণের প্রতিবাদ ছাড়া সরকারের এই প্রবৃত্তি বন্ধ হবে না। এখন জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলো গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে। হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গতকাল সোমবার দুপুরে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। দুপুর পৌনে ১টার দিকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলটি কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে বিজয়নগর নাইটিঙ্গেল মোড় হয়ে আবার বিএনপি কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। মিছিল থেকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়া হয়। একই সঙ্গে তারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেন।

এসময় রিজভী আহমেদ বলেন, সরকার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে রাজপথে আন্দোলন শুরু করা হবে। এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, এলএনজি গ্যাস ব্যবসায়ীদের পকেট ভারি করতে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে।

বাম গণতান্ত্রিক জোট গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে আগামী ৭ জুলাই সারা দেশে আধাবেলা হরতালের ডাক দিয়েছে। এ দিন তারা ভোর ৬টা থেকে সারা দেশে অর্ধদিবস হরতাল পালন করার ঘোষণা দিয়েছে।

জোটের নেতা গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি জানান, গতকাল সোমবার জোটের বৈঠকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সরকারের প্রস্তাবকে বামজোট ‘অনৈতিক’ বলে মনে করে। তাই এই অনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি।

ওয়ার্কার্স পার্টি পলিটব্যুরোর বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব গৃহস্থালি, পরিবহন, শিল্প খাত এবং বিদ্যুৎ খাতসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্রয়মূল্য বেড়ে যাবে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছে সিপিবি। সোমবার সিপিবি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসচি দিয়েছে। এই কর্মসূচি থেকে আরো বৃহত্তর কর্মসূচি দেয়ার কথা রয়েছে। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে রোববারই বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাসদ। নাগরিক ঐক্য গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। আগামী ৫ জুলাই বাদ জুমা বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে ইসলামী আন্দোলন। গতকাল সোমবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর উত্তরের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে জানিয়ে ঢাকা মহানগরের সভাপতি মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ জানান, বাজেটের কারণে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে গড়ে ৩২.৮ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়ানোর সরকারের সিদ্ধান্ত দেশবাসীর কাছে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। সব জিনিসের দাম বেড়ে যাবে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বাংলাদেশ ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ এক বিবৃতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অবিলম্বে, অযৌক্তিক, জনস্বার্থবিরোধী ও স্বেচ্ছাচারীভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

উল্লেখ্য, গতকাল থেকে গ্যাসের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ফলে এখন থেকে গ্রাহককে এক বার্নারের চুলার জন্য ৯২৫ টাকা ও দুই বার্নারের চুলার জন্য মাসিক ৯৭৫ টাকা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন, শিল্প ও বাণিজ্যক খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। শুধু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়নি। আগের দাম প্রতি ঘন মিটার ১৭ টাকা বলবত থাকবে।


বিভাগ : অর্থনীতি


Regent
এই বিভাগের আরও