ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে (পর্ব- ২): মাহিনুর জাহান নিপু

০৪ জুলাই ২০১৯, ০২:৩৪ পিএম | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:০৫ এএম


ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে (পর্ব- ২): মাহিনুর জাহান নিপু

আমার যত ঘোরাঘুরি দ্বিতীয় পর্ব ১ম অংশ --প্রথম বিদেশ ভ্রমণ।।

দূরে বহুদূরে, স্বপ্নলোকের উজ্জ্বয়নীপুরে।। খুজিতে গেছিনো কবে,শিপ্রা নদীর পাড়ে, মোর পূর্ব জনমের প্রথমা প্রিয়ারে।।প্রথম প্রিয়াকে খুঁজে বেড়ানোর মতো অনুভূতি নিয়েই আমরা ২০১২ সালের জানুয়ারীতে ঘুরতে গেলাম ইন্ডিয়া।

দিনটি ছিল ২৭ জানুয়ারী। আনন্দে আমি ভেসে গেলাম, আমি ভেসে গেলাম, আমি ভেসে গেলাম। প্রতিবেশী দেশ।অনেককিছুরই মিল আছে।বান্ধবী শিপ্রা বিশ্বাস।সে প্রায়ই তার বিভিন্ন সময়ের ইন্ডিয়া ভ্রমনের ছবিগুলো আমাকে দেখাতো।আমার খুবই ভালো লাগতো। শিপ্রা বলেছিল--যদি সারা ভারত ঘুরে দেখা যায় তাহলে বিশ্ব দেখা হয়ে যায়। তার কথায় এবং ছবি দেখে দেখে আমিও স্বপ্ন দেখতাম ভারত ভ্রমণের। যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি।গোছগাছ চলছে কি রাখবো আর কি নেব?।

১৬ দিনের ট্যুর। মানুষ ১২ জন । আমার পরিবার।বরের বন্ধু ডাঃ মইনুল ভাইয়ের পরিবার।সাথে আমার ননদ লুছি,বোন লিপু,ভাই জিলু ঝিলুর বন্ধু অনিক বরের বন্ধু কলেজ টিচার ফিরোজ ভাই।পুরা টিমেই মাশাল্লাহ আনন্দ রসের কমতি নাই।আমরা আবার দল বেধে ঘুরতে পছন্দ করি।এর মধ্যে আমি আবার হিন্দি শেখার বই কিনে হিন্দি শিখছি পুরোদমে। এত পড়া যদি অনার্স-মাস্টার্স এ পড়তাম তাহলে রেজাল্ট আরো ভালো হতো। জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ কিন্তু আমার প্লেনে হয়নি।বাই রোড।আমার বরের পোস্টিং তখন বেনাপোলে।তাই সিদ্ধান্ত হলো সেদিক দিয়েই যাব।এতে করে কাস্টমস এর ঝামেলা কম হবে। যাই হোক।আমরা সবাই পায়ে হেটে বেনাপোল বর্ডার অতিক্রম করে পেট্রাপোল গেলাম।পেট্রাপোলে ইন্ডিয়ান কাস্টমস এর ঝামেলা শেষ করে টাকা বদলে রুপি নিলাম।

বলে রাখি এটা প্রথম বিদেশ সফর হলেও ইন্ডিয়ার মাটিতে এটাই প্রথম পা রাখা নয়।বরের কাস্টমস এর চাকরী এবং বেনাপোলে পোস্টিং এর কারনে এর আগেও আমি আরো কয়েকবার বর্ডার ক্রশ করে ওপারে গিয়ে কেনাকাটা করেছি ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই।তাই এবারো যখন যাই তখন জায়গাটা আমার কাছে আর নতুন মনে হয়নি।এখান থেকে দুটো গাড়ীতে করে আমরা কলকাতা ট্রেন স্টেশন শিয়ালদহ যাই।আরেকটু লেট হলে ট্রেন মিস হয়ে যেত।রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকেট আগেই কাটিয়ে রেখেছিল কাউকে দিয়ে।খুব ছুটাছুটি করে অবশেষে ট্রেনে উঠতে পারলাম। কিন্তু হতাশ হলাম।এত ভীড়।থ্রি টায়ার এর ব্যাপারে আমাদের কোন ধারণা ছিলনা। এটা হলো ট্রেনের একতলা দুইতলা তিনতলা সীট ঘুমানোর জন্য। আমরা ভাবলাম থ্রি টায়ার বেশী ভালো হবে। বাস্তবে দেখলাম মাথার উপরে আরও দুই সীট।কবরের মতো লাগছিল আমার।এমনিতেই নড়বার জায়গা নেই তার উপর উরিশ্যার আরো কয়েকজন যাত্রী আমাদের রুমে এসে ঠেসে বসে পড়লো আর অনবরত কথা বলেই যাচ্ছে।অবশেষে রাত গভীর হলে পরিবেশ শান্ত হলো।

সকালে ঘুম ভাংলে দেখি আমরা দিল্লি স্টেশনে। দিল্লি স্টেশনে ডিউটিরত দারোয়ান এর সাথে কথা বলে জানালাম আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি ভারত ঘুরে দেখবো বলে।তিনি আমাদের স্টেশনের কাছেই এক ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে গেলেন। এখানে গিয়েই পেলাম শরত বাবুকে যিনি বাংলা বুঝেন এবং বলতে পারেন।শরতবাবু সম্ভবত ২লাখ ৯০ হাজার টাকায় আমাদের ১৪ দিনের এক প্যাকেজ দিলেন।আমরা কেরলবাগে হোটেল নিলাম। সেখান থেকেই পরদিন আমরা সিটি ট্যুর এ বের হলাম।আমরা দেখলাম ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল।ইন্ডিয়া গেইট,কুতুব মিনার,নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাঝার,লোটাস টেম্পল, আর মেট্রোরেল। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল শিখদের ধর্মীয় স্থান অক্সারধাম।শেষ বিকেলে যখন এর আলো জ্বলতে শুরু করে তখন সেটি এক অভাবনীয় রুপ ধারণ করে।।

পরিবারসহ লেখক

বেশ অনেকটা সময় কাটিয়ে আমরা ক্লান্তি আর মুগ্ধতা নিয়ে হোটেলে এলাম।কারণ পরেরদিনই খুব ভোরে যাত্রা করতে হবে আরেক ঐতিহাসিক স্থান ভালোবাসার নিদর্শন সপ্তমাশ্চর্যর একটি তাজমহল দেখার জন্য। অল্প বয়সে যখন বইতে পড়তাম তখন কত যে ইচ্ছে হতো তাজমহল দেখার।আজ সেটা পূরণ হতে যাচ্ছে। তাজমহল দেখতে যাবার পথেই আমরা প্রথম গেলাম সম্রাট আকবরের সমাধিতে।সুরংগ পথে অনেকটা পার হয়ে তবে তার কবরে পৌঁছাতে পেরেছি। আশেপাশে দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের কবর আর মাঝখানে সম্রাট আকবরের কবর।সমাধি থেকে বের হয়ে সেখানে অনেক বানর হরিণ আর ময়ূর দেখলাম।আমি অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম কখন তাজমহল দেখবো। তাজমহলে ঢুকতে যাবার গেইটে একটা মজার ব্যাপার হলো। বিদেশীদের জন্য প্রবেশ ফি ৫০০ টাকা আর ইন্ডিয়ানদের জন্য ৩০ টাকা। আমাদের মধ্যে আবার দু একজন ভালোই হিন্দি পারতো। তারা হিন্দিতে কথা বলে ৩০ টাকা ফি দিয়ে ঢুকে পড়ে আর দীর্ঘ লাইন পেড়িয়ে ৫০০ টাকা দিয়ে আমাদের যেতে হলো। ২২হাজার শ্রমিকের প্রতিকি হিসেবে ২২টি গম্বুজ দিয়ে বানানো হয়েছে তাজমহল যার স্থাপত্য শৈলী মুগ্ধ করছে পর্যটকদের যুগ যুগ ধরে। অনেকেই জানেন কি-না তাজমহল থেকে একটা নিকট দূরত্বে গেলে মহলটিকে বড় লাগে।ঢুকেই বামদিকে পেলাম বিখ্যাত ডায়না বেঞ্চ।এই বেঞ্চে ডায়না এসে বসে ছবি তুলেছিল তাই আমরাও ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। তাজমহলের মধ্যখানে মমতাজের কবর আর তার পাশেই সম্রাট শাহজাহান শুয়ে আছেন। যমুনা নদীর ওপারে সম্রাট আরেকটি মহল তৈরির কাজে হাত দিয়েছিলেন কিন্তু শেষ করা হয়নি।আমরা ঘুরে ঘুরে তাজমহল দেখতে লাগলাম আর অনুভব নিতে চেস্টা করলাম বিষয়টি আমাদের নিজেদের হলে কেমন লাগতো।।

তাজমহল দেখতে গেলে আপনারা অবশ্যই ফতেহপুর সিক্রি দেখে আসবেন। এত সুন্দর। আমাকে অনেক বেশী মুগ্ধ করেছে।অতি সুন্দর স্থাপত্য নকশা। আনার কলির কবর দেখলাম এখানেই। এখানেই সম্রাট আকবরের দরবার ছিল।পরদেশ' আর 'যোধা আকবর'সহ অনেক ছবির শুটিং এখানেই হয়েছে।এখানে বসেই রাজত্ব করার কারন হতে পারে উপর থেকে শহরের অনেকাংশই দেখা যায়।বিশাল প্রাচীর ঘেরা লাল ইটের এ স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হবে সবাই। বেশীক্ষণ থাকা হলো না সন্ধ্যা হয়ে গেল বলে। পরদিন গেলাম রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর।। জয়পুর নিয়ে পরে একসময় লিখবো ইনশাআল্লাহ।

মাহিনুর জাহান নিপু,নরসিংদী 


বিভাগ : জীবনযাপন