বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

২৯ মার্চ ২০২২, ০২:০০ পিএম | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৪, ০৪:৩০ পিএম


বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

ড. মুহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী

১৯৭১ সাল রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে একটি ভূ-খন্ড প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে এক বৎসরে কোন ভূখন্ডে সার্বাধিক নিরাপরাধ মানব সন্তানকে হত্যার বছর। কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মরক্ষা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের বছর। এ বছর বিশ্বমানচিত্রে স্থান করে নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। তারই প্রেক্ষাপটে আমরা লাখো কন্ঠে গাই -


“একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার
সারা বিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহংকার।”

শত ঘাত-প্রতিঘাত, নানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাঁধা অতিক্রম করে অদম্য মনোবলের অধিকারী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী সশ¯্র দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাজিত করে ছিনিয়ে আনে লাল সবুজের বাংলাদেশ। যুদ্ধকালীন বিরোধী শক্তি নানাভাবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে সচেষ্ট হলেও এদেশের অসম সাহসী মানুষ এগিয়ে চলেছে বুক চেতিয়ে। যেমনি কামানের গোলার সামনে চলেছেন একাত্তরে।


মার্কিন অর্থনীতিবিদ হলিস বি. শেরানি ১৯৭৩ সালে বলেছিলেন বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে ১২৫ বছর সময় লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষ এ অর্থনীতিবিদের শংকাকে ভুল প্রমাণিত করে স্বাধীনতার ৪০ বছরের মাঝেই মাথাপিছু আয় ৯২৮ ডলারে উন্নীত করেন। ২০১১ সাল থেকে মাত্র ৮ বছরে ব্যবধানে মাথাপিছু আয়কে দ্বিগুণ করে ১ হাজার ৯০৯ ডলারে উন্নীত করেছেন এদেশের খেটে খাওয়া সংগ্রামী মানুষ। ১৯৭০ দশকে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে যারা বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের টেস্ট কেস’ বলে অভিহিত করেছিলেন সেই উন্নয়ন তাত্ত্বিকগণই এখন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশকে Development surprise বলে অভিহিত করেছেন। যে বাংলাদেশের পরিচয় ছিল ভুখা-নাঙ্গা, বন্যা, সাইক্লোন, হত-দরিদ্র ও অনুন্নত দেশ, সে বাংলাদশেই এখন বিশে^র ৩০তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনোমিক্স এন্ড বিজনেস রিসার্চ 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল ২০২১' নামের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি হবে ২৫ নম্বর অর্থনীতির দেশ।


বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করছেন যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে এবং ভিশন ২০৪১ এর মাধ্যমে আমরা আধুনিক এবং উন্নত দেশে পরিণত হবো। বাংলাদেশ অনেক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে, ফ্লাইওভার করা হয়েছে, মেট্রোরেল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে মায়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাছাড়া ভারতের সাথে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কয়েক দশকের ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। দেশজুড়ে রাস্তাঘাট কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ নিজস্ব অর্থায়নে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচক ও জরিপে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই দক্ষতার সাথে মহামারি করোনা মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছে এবং বিশ্বের বহু বড় বড় দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ প্রথম সারির দেশ হিসেবে কোভিড-১৯ এর টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে।


প্রত্যাশার বাংলাদেশ : বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতিসত্তা, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা বিনির্মাণ। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলাদেশের মানুষ নয় মাসে নয় শতাব্দীর পথ পাড়ি দিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বঙ্গবন্ধু শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন বক্তৃতা ও সংবিধানে উল্লিখিত নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণায় বাংলাদেশের প্রত্যাশা উপস্থাপিত হয়েছে।


১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারগার হতে মুক্ত হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু বলেন, “...যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকুরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে-পূর্ণ হবে না।’ বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, ‘...যার যার কাজ করে যান।’ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আদর্শ কি হবে এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’ তিনি আরো বলেন, ‘...বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলতে হবে। একটি লোককেও আর না খেয়ে মরতে দেওয়া হবে না। সকল রকমের ঘুষ লেনদেন বন্ধ করতে হবে।’


দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আজ কে দুর্নীতিবাজ? যে ফাঁকি দেয় সে দুর্নীতিবাজ। যে ঘুষ খায় সে দুর্নীতিবাজ, যে স্মাগলিং করে সে দুর্নীতিবাজ, যে ব্লাক মাকের্টিং করে সে দুর্নীতিবাজ, যে হোর্ড করে সে দুর্নীতিবাজ। যারা কর্তব্য পালন করে না তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে তারাও দুর্নীতিবাজ। যারা বিদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে তারাও দুর্নীতিবাজ। এ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের দমনে তিনি জনগণের সমর্থন কামনা করেন। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের যদি খতম করা যায় তা হলে বাংলাদেশের মানুষের ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দুঃখ চলে যাবে।


সম্প্রদায়িকতাকে বঙ্গবন্ধু ঘৃণা করেন। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘জীবনভর আমি সাম্প্রদায়িতকার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। যার মনের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা আছে সে হলো বন্য জীবের সমতুল্য। ...ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাকে সমুন্নত রাখো।’


পরীক্ষায় নকল বন্ধ করা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, পুলিশ দিয়ে ছাত্রদের নকল বন্ধ করতে হবে এ কথা কার কাছে বলব? দোহাই আল্লাহর। নকল বন্ধ করার জন্য আর যেন পুলিশ দিতে না হয়। বাবারা, একটু লেখাপড়া শিখ। যতই জিন্দাবাদ আর মুর্দাবাদ কর, ঠিকমত লেখাপড়া না শিখলে কোন লাভ নাই। আর লেখাপড়া শিখে যে সময়টুকু থাকে বাপ-মাকে সাহায্য কর। প্যান্ট পড়া শিখেছো বলে হাল ধরতে লজ্জা করো না, কোদাল মারতে লজ্জা করো না।...কাজ করো কঠোর পরিশ্রম করো, না হলে বাঁচতে পারবে না। শুধু শুধু বিএ, এম এ পাস করে লাভ নাই।’


প্রত্যাশার বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে ১৯৭২ সালের সংবিধানে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য কমিটি গঠন করা হয় এবং ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধান জাতীয় পরিষদে গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর হতে সংবিধান কার্যকর হয়।


বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। জীবনধারণের অধিকার, চলাফেরার অধিকার, বাকস্বাধীনতার অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, ধর্ম চর্চার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি মৌলিক অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত হয়।


বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিক এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।”
সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির বৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা, কর্মের অধিকার, কর্মের বিনিময়ে যৌক্তিক মজুরি লাভ, যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম ও বিনোদনের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার প্রভৃতির কথা সংবিধানে বলা হয়েছে।


সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগত দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণ, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন।
সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন, স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, মদ্য ও অন্যান্য মাদক নিষিদ্ধ করা হয়। তাছাড়া এ অনুচ্ছেদে গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের কথা বলা হয়েছে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতির অন্যতম ছিল আন্তর্জাতিক নীতি। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছে।


বাংলাদেশের সংবিধানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সংবিধানের ২৭ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা উলেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের আশ্রয় সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া ৩৫ অনুচ্ছেদে অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ ছিল এরূপ আইনেই বিচারের কথা বলা হয়েছে।


প্রাপ্তির বাংলাদেশ
নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগ, মানবসৃষ্ট দূর্যোগকে মোকাবলা করে ১৭ কোটি মানুষের এ বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে চলেছে উন্নয়ন তাত্ত্বিকদের আশংকাকে ভুল প্রমাণিত করে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে নিম্নে বাংলাদেশের নানাবিধ অর্জনগুলো তুলে ধরা হলো:


অর্থনৈতিক অগ্রগতি: ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ১১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা যা জানুয়ারি ২০২২ এ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৯৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ও আয়ের দেশ ভারতকে পর পর দু বছর মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলছে লাল সবুজের বাংলাদেশ। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭ শত ৮৬ কোটি টাকা ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি ৮১ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১.২ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে বেড়েছে রপ্তানি পণ্যের সংখ্যাও। স্বাধীনতার পর রপ্তানি আয়ের সত্তর ভাগ ছিল পাটের দখলে। বর্তমানে মোট রপ্তানির ৮২ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের দখলে। দেশে বাড়ছে রেমিটেন্স প্রবাহ। জানুয়ারি ২০২২ এ দেশে রেমিটেন্স এসেছে ১৪৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৯৪ ডলার যা ৩০১গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ ডলারে। সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭১গুণ। বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে দেশের প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে যা একদিকে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। এছাড়া দেশের উন্নয়নে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি আধা-দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক কাজ করে দেশ মাতৃকার জন্য রেমিটেন্স পাঠিয়ে চলেছেন যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে দ্রুততর করেছে।


দারিদ্র্য বিমোচন: সাধারণত দারিদ্র্য বলতে এমন একটি অবস্থাকে বুঝায় যখন মানুষ তার উর্পাজন দ্বারা জীবন ধারণের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মিটাতে পারে না। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা প্রভৃতি মৌলিক চাহিদা পূরণের অক্ষমতাই হল দারিদ্র্য। বিশ্ব ব্যাংক বলেছে “যারা দৈনিক ১.৯০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ আয় করতে পারে না তারাই দরিদ্র।” জনসংখ্যার ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দরিদ্রপীড়িত রাষ্ট্র। বর্তমানে ১৫৪টি দরিদ্রপীড়িত রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৪ তম। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮০-৯০% ছিল দরিদ্র। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ২০২১ দারিদ্র্যে প্রবণতা কমে দাঁড়িয়েছে ২০.৫% এবং অতিদরিদ্রের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১০.৫ শতাংশে।


কৃষি: কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামে বসবাস করে। কৃষি বাংলাদেশের জনগণের প্রধান পেশা। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচিত। স্থিরমূল্যে দেশজ উৎপাদনে কৃষির বিভিন্ন উপখাতের অবদান হ্রাস পেলেও এককভাবে এখনও কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির বৃহৎ খাত। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি উর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষণীয়। ১৯৭১ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ কোটি মেট্রিক টন যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪.৫৩ কোটি মেট্রিক টন। বাংলাদেশ বর্তমানে পাট ও কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, ধান ও সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, আম ও আলু উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম। কৃষি বিশেষত খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের এ উন্নয়ন একদিকে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে সহায়তা করেছে অন্যদিকে দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির যোদান দিতে মৎস্য প্রাণি সম্পদ খাত অবদান রেখে চলেছে। বিপুল জনসংখ্যার এদেশের উন্নয়নের জন্য কৃষির আধুনিকীকরণ ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে।
সামাজিক উন্নয়ন এমন একটি প্রচেষ্টা বা পদক্ষেপ যার মাধ্যমে সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করে সার্বিক উন্নয়নকে তরান্বিত করা হয়। বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী সামাজিক উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।


শিক্ষা: মানসম্মত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান করে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি কার্যক্রম, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন, ছাত্র-শিক্ষক সংযোগ ঘন্টা বৃদ্ধি প্রভৃতি উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৭৩১টি যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ২টিতে। প্রাথমিক শিক্ষায় ১৯৭২ সালে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৬৪.১৬ লক্ষ যার মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৩৪.৬২ শতাংশ। ২০২০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২.১৬ কোটি যার মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থী ৫১ শতাংশ।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৯০টি যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৮৪৯ টি। মাধ্যমিক শিক্ষায় ১৯৭০ সালে ছাত্রী ভর্তির হার ছিল ১৮.৪২% যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেযে দাঁড়ায় ৫৪.৮৬%। ১৯৭২ সালে দেশে কলেজ ছিল ৫২৬টি যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৯৯টি। দেশে বর্তমানে মাদ্রাসার সংখ্যা ৯ হাজার ৩০৫টি। তাছাড়া দেশে ২০২০ সালে কারিগরী ও ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ৪৭৪টি। দেশে ১৯৭২ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪৬টি। তাছাড়া দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৫টি। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে শিক্ষাখাতে সরকারের বরাদ্দ ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রভাব দেশের শিক্ষার হার বা সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭২ সালে দেশে শিক্ষা বা সাক্ষরতার হার ছিল ১৬.৮ শতাংশ যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭৫.৬%।


স্বাস্থ্য সূচকে উন্নয়ন: বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের অগ্রগতির ইতিবাচক প্রভাব দেশের স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন সূচকে লক্ষণীয়। শিক্ষা মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশে শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রভাব দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। মানব উন্নয়ন বা সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে স্বাস্থ্য বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের জনগণের জন্য সুলভে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার কল্যাণ সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
১৯৭৪ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২.৪৮ যা ২০২০ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১.৩৭ শতাংশে। ১৯৭৫ সালে প্রতি বিবাহিত নারীদের শিশু জন্ম দেওয়ার হার ৬.৩ জন যা ২০২০ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২.১ জনে। ১৯৭২ সালে শিশু মৃত্যুর হার ছিল (প্রতি হাজারে জীবিত জন্মে) ১৪১ জন যা ২০২০ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। ১৯৭২ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল (প্রতি লাখে জীবিত জন্মে) ≤ ৬০০ জন যা ২০২০ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে। ১৯৭৫ সালে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রি ব্যবহারের হার ছিল ৮% যা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩.৯ শতাংশে। ২০২০ সালে সুপেয় পানি গ্রহণকারীর হার ৯৮.৩% এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারকারী ৮১.৫ শতাংশ।


প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল: জনগণের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল একটি দেশের সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত। মানুষের আয় বৃদ্ধি, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যখাতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য প্রবণতা হ্রাস প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশের মানুষের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল ৩৭ বছর ১৯৯০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৬.১% এবং ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭২.৮ বছরে।


উন্নয়ন আনুভূমিক ও উলম্ব পদ্ধতিতে সংগঠিত হয়। আনুভূমিক হলো সংখ্যা বা পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং উলম্ব হলো গুণ বৃদ্ধির মাধ্যমে। বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেলেও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে কর্মমুখী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগের ফলাফল হাতে পেতে ১০-২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়। নবজাতক ও শিশুমৃত্যু রোধে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী Millennium Development Goals পুরস্কারে ভূষিত হন। স্বাস্থ্যখাতে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা প্রদানের জন্য ২০১১ সালে South-South Award অর্জন করেন। দারিদ্র্য বিমোচনে অভাবনীয় সাফল্যের জন্য ২০১৩ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে Achievement in Fighting Poverty পুরস্কারে ভূষিত করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান Champion of the Earth পুরষ্কার লাভ করেন। ২০১৬ সালে UN Women মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে Planet 50-50 Champion পুরস্কারে ভূষিত করেন। তাছাড়া এGlobal Partnership Forum তাঁকে Agent of Change হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। নারী অধিকার সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে Global Women’s Leadership পুরস্কারে ভূষিত করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সকল আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তির সাথে এদেশের সাধারণ জনগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে পুরস্কার গ্রহণ করে তিনি তাঁর দেশের মানুষের অর্জন বলে এসব জনগণকে উৎসর্গ করেছেন।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ।


বিভাগ : মতামত


এই বিভাগের আরও