স্বর্ণালংকারের জনপদ

১৬ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ পিএম | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০২ এএম


স্বর্ণালংকারের জনপদ

মোহাম্মদ নাজমুল 

 

হাঁটছি, ক্যাম্পাসে ফিরবো। বাস ধরতে গিয়ে এখনও থমকে যাই— সেই পুরনো প্রেম। সেইসব স্কুলপলাতক উচ্ছ্বাসে চড়ে লটকন বাগানে ঘুরে বেড়ানোর দিনগুলো আরও বেশি নাড়া দেয়, যখন মরজালের লটকনের হাট চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

 

আমি মরজালের ছেলে। লালমাটির এই জনপদের পরিচয় শুধু মানচিত্রে নয়, মানুষের মুখেও। কেউ বলে লটকনের রাজধানী, কেউ বলে সোনার ফলের গ্রাম। ছোটবেলায় বুঝিনি, গাছে ঝুলে থাকা হলুদ ফলগুলোর ভেতর কত মানুষের হাসি, কত পরিবারের স্বপ্ন আর কত অর্থনীতির গল্প লুকিয়ে আছে। এটি এমন এক জনপদ, স্বর্ণের গয়না নয় - এখানকার মানুষের প্রেম হয় সোনালী ফলের সাথে। 

 

 

বর্ষা আসার আগমুহূর্তে যখন গাছের ডালভর্তি সোনালি লটকন ঝুলে থাকে, দূর থেকে মনে হয় যেন কেউ সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে স্বর্ণালংকার ঝুলিয়ে রেখেছে। সূর্যের আলো পড়লে সেই দৃশ্য আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। এ যেন প্রকৃতির নিজের হাতে সাজানো অলংকার।

আমাদের এলাকায় কেউ একে লটকন বলে, কেউ বলে বগি, আবার ব্যবসায়ীদের কাছে এটি "গোডা" নামে পরিচিত। নাম ভিন্ন হলেও ভালোবাসা একই। এখানে লটকন কেবল একটি ফল নয়; এটি একটি ফসল, একটি অর্থনীতি, একটি মৌসুমি উৎসব।

ফেব্রুয়ারি মাসে গাছে মুকুল আসে। তারপর ধীরে ধীরে সবুজ ফল বড় হতে হতে মে মাসের শেষ দিক থেকে সোনালি রঙে রূপ নেয়। শুরু হয় লটকনের মহোৎসব। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকেরা ভ্যানভর্তি লটকন নিয়ে চলে আসেন মরজাল বাজারে। চারপাশে শুধু লটকনের স্তূপ, দরদাম, হাসিমুখ আর ব্যস্ততা। কৃষকের ঘামে ভেজা সেই সকালগুলো আমার কাছে কোনো উৎসবের চেয়ে কম নয়।

 

 

এই বাজার থেকেই প্রতিদিন শত শত মণ লটকন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা, কাওরান বাজার, সাভার, কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ— কোথায় যায় না এই ছোট্ট ফল! আকারভেদে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ১৩০ টাকায় পাইকারি বিক্রি হয়। এরপর নতুন করে প্যাকেটজাত হয়ে পৌঁছে যায় দেশের নানা শহরে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারেও এই ফলের সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে।

 

 

নরসিংদীর রায়পুরা, শিবপুর ও বেলাব উপজেলার কয়েকটি গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের চাষ হয়। তবে মরজাল, বটিয়ারা, গিলাবের, কুমারটেক, আজগিতলা, জয়নগর, পাহাড় উজিলাব ও ধুকুন্দি— এই গ্রামগুলোর নাম এলেই লটকনের কথা আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে লটকন এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেন একে বাদ দিলে গ্রামের পরিচয়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

 

 

 

লটকনের সৌন্দর্য যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি এর পুষ্টিগুণও অসাধারণ। এতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং সামান্য পরিমাণ প্রোটিন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, ত্বকের সুস্থতা বজায় রাখা এবং হজমশক্তি উন্নত করতে এই ফল বেশ কার্যকর।

 

প্রতি বছর লটকনের মৌসুম এলে আমি শুধু একটি ফল দেখি না; আমি দেখি আমার শৈশব, দেখি স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাগানে ঘুরে বেড়ানো, গাছের নিচে বসে হাসি-আড্ডা, দেখি কৃষকের ঘামে লেখা সফলতার গল্প। দেখি এমন এক জনপদ, যেখানে সোনার গয়না নয়, গাছে ঝুলে থাকা সোনালি ফলই মানুষের মুখে সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসি ফোটায়।

 

আমার কাছে লটকন কোনো সাধারণ ফল নয়। এটি আমার গ্রামের পরিচয়, আমার শিকড়ের গন্ধ, আমার শৈশবের স্মৃতি, আর হাজারো কৃষক পরিবারের জীবিকার প্রতীক। যতদিন মরজালের মাটিতে লটকনের বাগান থাকবে, ততদিন এই জনপদকে আমি স্বর্ণালংকারের মতোই ঝলমলে দেখব।



এই বিভাগের আরও