৩৫ টাকার মুরগির বাচ্চা ১ টাকায়ও নিচ্ছে না কেউ

২৮ মার্চ ২০২০, ০৮:২৬ পিএম | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০২:৫৫ পিএম


৩৫ টাকার মুরগির বাচ্চা ১ টাকায়ও নিচ্ছে না কেউ
ফাইল ছবি

অর্থনীতি ডেস্ক:

একটা ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা বিক্রি হতো ৩৫ টাকায়। সেই দাম কমতে কমতে ঠেকেছে ১ টাকায়। তাও কেউ নতুন করে খামারে মুরগির বাচ্চা নিচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে না বিধায় প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ মুরগির বাচ্চা মেরে ফেলতে হচ্ছে কোনো কোনো হ্যাচারি প্রতিষ্ঠানকে। করোনাভাইরাসের কারণে গোটা দেশে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব এমনভাবেই পড়েছে পোল্ট্রি শিল্পে। মুরগি, বাচ্চা, ডিম- কোনো কিছুই বেচা-কেনা যাচ্ছে না। স্বভাবতই মাথায় হাত পড়েছে এই শিল্পের ব্যবসায়ীদের।

গাজীপুর জেলার টঙ্গী কুদাবো এলাকার পোল্ট্রি খামারি সেলিনা পারভীন ১০ লাখ টাকা লোকসান দিয়ে কয়েকদিন আগে তার ডিম পাড়া আড়াই হাজার মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। ডিমের দাম ক্রমান্বয়ে কমতে থাকায় এবং খাবারের দাম বাড়তে থাকায় তিনি মুরগিগুলো বেচে দেন। পরিস্থিতি দেখে তারপর তিনি এ ব্যবসা চালিয়ে যাবেন কি-না, সে সিদ্ধান্ত নেবেন।

সেলিনা পারভীন বলেন, আমার খামার খালি দেখে হ্যাচারি মালিকদের পক্ষ থেকে আমাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল যে প্রতি পিস মুরগির বাচ্চার দাম নেবে ১ টাকা। ৫ হাজার বাচ্চা নেয়ার জন্য অনুরোধ করেছে। আমি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছি। কারণ দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে কতোদিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা বলা যাচ্ছে না। এমনিতেই ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। আর লোকসানের ভার বাড়াতে চাই না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোর অঞ্চলের আফিল হ্যাচারি ও কাজী হ্যাচারিসহ ছোট-বড় পাঁচটি হ্যাচারিতে প্রতিদিন চার লাখ বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিটি বাচ্চা উৎপাদনে হ্যাচারি মালিকদের খরচ হয় ৩২ টাকা। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে পোলট্রি মুরগির ব্যবসায় এক প্রকার ধস নেমেছে। হ্যাচারি থেকে খামারিরা বাচ্চা কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।

সূত্র জানায়, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করায় তা তাৎক্ষণিক বন্ধ করা যাচ্ছে না। এজন্য প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ মুরগির বাচ্চা মেরে ফেলতে হচ্ছে। গুজবে পোলট্রি মুরগির মাংস বিক্রিতেও ধস নেমেছে। এতে কোটি কোটি টাকার লোকসানের শিকার হ্যাচারি মালিকরা।

যশোরে সবচেয়ে বেশি বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আফিল অ্যাগ্রো লিমিটেড প্রতিদিন ১ লাখের বেশি বাচ্চা উৎপাদন করে। এ ফার্মের টেকনিক্যাল ম্যানেজার তোফায়েল আহমেদ জানান, ডিম পাড়ানোর চার মাস আগে একটি মুরগি প্রস্তুত করা হয়। এ মুরগি টানা দেড় বছর ডিম দেয়। প্রতিদিন বাচ্চা উৎপাদনের জন্য ২১ দিনের ডিম ইনকিউবেটর মেশিনে চাপাতে হয়। এক দিন বয়সী বাচ্চা বিক্রি করা হয়। বাচ্চা উৎপাদন বন্ধ করতে হলে কমপক্ষে ২১ দিন অপেক্ষা করতে হয়। আবার উৎপাদন প্রক্রিয়া একবার বন্ধ করলে পুনরায় চালু করা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। সেক্ষেত্রে হ্যাচারি একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রতিষ্ঠান শত কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়বে।

পোলট্রি শিল্পের সবচেয়ে বড় বিপণন প্রতিষ্ঠান তামিম মার্কেটিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) খন্দকার ইদ্রিস হাসান জানান, এক দিন বয়সী প্রতিটি বাচ্চা উৎপাদন খরচ ৩২ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ টাকারও কম দরে। তাও আবার ক্রেতা খুঁজে আনতে হচ্ছে। শুধু বাচ্চা নয়, লেয়ার মুরগির ডিম ও পোলট্রি ফিডেও করোনার প্রভাব পড়েছে।

তামিম মার্কেটিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের উপ-ব্যবস্থাপক (ব্রয়লার) আব্দুল মুকিত জানান, যশোর অঞ্চলের ১ হাজার খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে ১১ লাখ কেজি ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে শুধু আফিল ফার্ম থেকে উৎপাদিত হয় দিনে ২৫ হাজার কেজি। এক কেজি ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনে খরচ হয় ১১০ টাকা। বর্তমানে বাজার পড়ে যাওয়ায় প্রতি কেজি ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের বাজারও পড়তির দিকে। এ অঞ্চলে প্রতিদিন ৫ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে আফিল ফার্ম উৎপাদন করে ৪ লাখ। প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ সাড়ে ৭ টাকা। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৬ টাকা।

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের বিস্তাররোধের কার্যক্রমে বাংলাদেশে অনেকটা অচলাবস্থার তৈরি হয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। অন্যদের মতো পোল্ট্রি শিল্পের ব্যবসায়ীরাও করোনাভাইরাসের প্রকোপ কবে কমবে, সে প্রহর গুনছেন। (সূত্র: জাগো নিউজ)


বিভাগ : অর্থনীতি