শূন্যতার সওদাগর

৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০২ এএম


শূন্যতার সওদাগর

গল্প / রওনক জাহান মুন: 

চণ্ডীপুর শহরের ভাঙা রেললাইনের ধারে সময় থমকে থাকে। এখানকার বাতাসে জুটমিলের পুরনো ধুলো আর মরা নদীর শ্যাওলার গন্ধ। এই শহরের এক কোণে ন্যাংটা বাবার আস্তানা, যেখানে কোনো কবর নেই; আছে শুধু একটা বিশাল মার্বেল পাথর, যা অমাবস্যায় বরফের মতো ঠান্ডা আর পূর্ণিমায় ফুটন্ত কয়লার মতো গরম হয়। মাজারের প্রধান খাদেম রহমান বাদশাহ। মাথায় সাদা পাগড়ি আর চোখে সুরমা মাখা এই মানুষটি বিশ্বাস করেন, মানুষের স্মৃতি আসলে এক ধরনের জাদুকরি সুতো, যা দিয়ে নিয়তি তার নকশা বোনে।

 

 

একদিন শেষ বিকেলে চণ্ডীপুরে এসে নামল এক তরুণী। নাম তার জ্যোৎস্নাময়ী। তার পরনে ওল্ড-স্কুল ক্যারিবিয়ান ব্লু শাড়ি, মাঝারি উচ্চতা,পান্ডুর মুখ। রহস্যময় ব্যাপার হলো, চণ্ডীপুরের কড়া রোদেও মাটিতে তার কোনো ছায়া পড়ছিল না। সে সোজাসুজি এসে দাঁড়াল মাজারের বারান্দায়, যেখানে রহমান বাদশাহ তখন লণ্ঠন পরিষ্কার করছিলেন।

 

রহমান বাদশাহ চোখ তুলে তাকালেন। তাঁর বুড়ো চোখের মণি দুটো চমকে উঠল। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "তুমি এলে, জ্যোৎস্না? তোমার বাবা তোমাকে এই মাজারের ভেতর পাঠাতে চাইল শেষ পর্যন্ত?"

 

 

জ্যোৎস্নাময়ী হালকা হাসল। সেই হাসির শব্দে মাজারের পেছনের মরা দিঘির পানি এক ফোঁটা রক্তবর্ণ ধারণ করল। সে বলল, "ফুফামণি, বাস্তব পৃথিবীটা বড্ড বেশি চেনা, বড্ড বেশি কর্কশ। সেখানে নিয়তি আগে থেকেই ছক কাটা। আমি আমার ভবিষ্যৎটা এই মাজারে দান করতে এসেছি।"

রহমান বাদশাহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সম্পর্কে তিনি জ্যোৎস্নাময়ীর ফুফা। তিনি জানেন, এই মাজারের নিয়ম বড় অদ্ভুত। এখানে মানুষ টাকা পয়সা দেয় না, দেয় নিজেদের তীব্র দুঃখের স্মৃতি। কেউ যদি তার দুঃখের কথা কাগজে লিখে মাজারের দেয়ালে গুঁজে দেয়, তবে অলৌকিকভাবে সে তা ভুলে যায়। কিন্তু ভবিষ্যৎ দান করার অর্থ হলো—বর্তমানকে স্তব্ধ করে দেওয়া।

 

"ভবিষ্যৎ বিলিয়ে দিলে তুই যে এই সময়হীন কুয়াশায় আটকে যাবি, মা," রহমান বাদশাহ সতর্ক করলেন।

"আমি তো স্তব্ধ হতেই এসেছি, ফুফামণি," জ্যোৎস্নাময়ী বলল। তার চোখের মণি দুটো ঠিক বিড়ালের মতো সবুজ হয়ে উঠল। সে তার ব্যাগ থেকে একটা খাঁটি হাতে আঁকা কয়লার স্কেচ বের করল. স্কেচটিতে একটা মেয়ে চিলতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পায়ের কাছে একটা কালো বিড়াল অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। 

রহমান বাদশাহ লণ্ঠনটা উঁচিয়ে ধরলেন। জাদুকরি নিয়মে, কাগজের সেই স্কেচটা আস্তে আস্তে জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগল। ছবির বিড়ালটা ম্যাও করে ডেকে উঠল, আর কাগজের ভেতর থেকে জুঁই ফুলের তীব্র সুবাস ছড়িয়ে পড়ল পুরো মাজার প্রাঙ্গণে।

 

 

সেই রাতে চণ্ডীপুরের আকাশে একসঙ্গে দুটো চাঁদ উঠল—একটি রুপোলি, অন্যটি গাঢ় লাল। রহমান বাদশাহ পরম মমতায় তাঁর স্ত্রীর ভাতিজির হাত ধরে মাজারের সেই মার্বেল পাথরের ওপর বসিয়ে দিলেন। পাথরটা তখন নরম তুলোর মতো কোমল হয়ে গেছে। জ্যোৎস্নাময়ী চোখ বন্ধ করতেই চারপাশের পরিত্যক্ত জুটমিলের চিমনিগুলো থেকে ধোঁয়ার বদলে হাজার হাজার রঙিন প্রজাপতি উড়তে শুরু করল।

পরের দিন সকালে, চণ্ডীপুরের মানুষ মাজারে এসে আর কোনো মেয়েকে দেখতে পেল না। কিন্তু মাজারের প্রাচীন দেয়ালে অলৌকিকভাবে নতুন একটি অবয়ব ফুটে উঠেছে—ঠিক সেই কয়লার স্কেচটি, যা এখন দেয়ালের পাথরের সাথে মিশে গেছে। আর খাদেম রহমান বাদশাহ তখন মাজারের এক কোণে বসে মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছিলেন। চায়ের ফুটন্ত পানিতে তখন একটা নতুন সুর বাজছিল—ঠিক যেন কোনো দূরবর্তী ট্রেনের হুইসেল, যা চেনা বাস্তবকে ফুঁড়ে এক অবাস্তব অনন্তের দিকে ছুটে চলেছে।


বিভাগ : বিনোদন


এই বিভাগের আরও